অজয় রায়

বাংলাদেশী পদার্থবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞান লেখক ও মানবাধিকারকর্মী

অজয় রায় (১ মার্চ ১৯৩৫- ৯ ডিসেম্বর ২০১৯) বাংলাদেশি পদার্থবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞান লেখক এবং মানবাধিকার কর্মী ছিলেন। স্কুল এবং কলেজ জীবনে পড়াশোনা করেছেন দিনাজপুরে। ১৯৫৭ সালে এমএসসি পাশ করে যোগ দেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। তিনি ১৯৫৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। অতঃপর ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের লীডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৭ সালে সেখানেই করেন পোস্ট ডক্টরেট। ১৯৬৭ সালে শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগদান করেন এবং অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন। দেশি এবং বিদেশি বহু জার্নালে তার অভিসন্দর্ভ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি পদে আসীন ছিলেন। তিনি আমৃত্যু সম্প্রীতি মঞ্চের সভাপতি, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং এশিয়াটিক সোসাইটির বিজ্ঞান বিভাগের সম্পাদক ছিলেন। তাছাড়া শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চের সভাপতি এবং দক্ষিণ এশীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সংগঠনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যও ছিলেন। তিনি মুক্তমনার উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং মুক্তান্বেষার সম্পাদক ছিলেন। কলামিস্ট হিসবেও তিনি দৈনিক সমকালে লেখালেখি করতেন। মৃত্যুর পূর্বাবধি তিনি বাংলা একাডেমির ৩ খণ্ডে ‘বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস’ গ্রন্থেও সম্পাদক হিসেবে কাজ করছিলেন।

  • পলিমাটির দেশ বাংলা। জল-বৃষ্টি-বন্যা আর জোয়ারের দেশ। নামেই তার পরিচয়। নির্দিষ্ট করে বলার উপায় নেই। তবু, পণ্ডিত ব্যক্তিরা যে অনমান করেছেন তার সূত্র ধরেই বলা চলে, 'বঙ্গ’- যা থেকে এসেছে বাঙ্গালা দেশের নাম— শব্দটি মূলে ছিল চীন-তিব্বতী গোষ্ঠীর শব্দ | আর এই বঙ্গ শব্দের ‘অং' অংশের সাথে গঙ্গা, হোয়াংহো, ইয়াং-সিকিয়াং ইত্যাদি নদী-নামের সম্বন্ধ ধরে তাঁরা অনমান করেছেন যে শব্দটির মৌলিক অর্থ ছিল জলাভূমি। আবল ফজল তাঁর 'আইন-ই-আক- বরীতে' বাঙ্গালা শব্দটির আর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন বঙ্গ শব্দের সাথে আল্‌ যুক্ত হয়ে হয়েছে বাঙ্গাল বা বাঙ্গালা। আর আল বলতে তো শুধু, ক্ষেতের আল বোঝায় না, ছোট-বড় বাঁধও বোঝায়। বাংলাদেশ বন্যা আর বৃষ্টির দেশ, কাজেই ছোট-বড় বাঁধেরও দেশ। নামের সাথেই মিলেমিশে রয়েছে দেশের প্রকৃতি।
  • অনেক কিছুর মতোই ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বাঙ্গালা দেশের চতুঃসীমারও পরিবর্তন হয়েছে। সুপ্রাচীনকালে বঙ্গ বা বাঙ্গাল বলতে যে জায়গা বোঝাত তা আজকের পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার অংশ মাত্র। বৃটিশ ভারতে বাংলদেশের যে চতুঃসীমা, তা তখন ছিল বিভিন্ন জনপদের সমষ্টি। এই জনপদগুলির নাম কি ছিল, কোথায় অবস্থিত ছিল এগুলো বা এখানে কারা বাস করতো, সে কথা পরে। যেটা লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার তা হল সপ্তম-অষ্টম শতক থেকেই কখনো বা পাল সাম্রাজ্যের আওতায়, আবার কখনো সেন রাজ্যের সীমানার মাঝে ধীরে ধীরে এই জনপদগলি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছিলো। আরও পরে, পাঠান আমলে বঙ্গ নামেই বাংলার সবগুলো জনপদ ঐক্যবদ্ধ হয়। সেই থেকে এই ভূভাগের সবটকুই বঙ্গ বা বাঙ্গালা নামে পরিচিত।
  • ইতিহাসের উত্থান-পতনের সাথে সাথে রাজনৈতিক সীমারেখার পরিবর্তন সত্ত্বেও বাংলা ভাষাভাষী বাঙালীরা যে ভূভাগে বাস করে তার প্রাকৃতিক সীমারেখার বদল আজ পর্যন্তও হয়নি।
  • বাংলা নদীবহুল দেশ। নদী বাংলার প্রাণ। নদীপথে বাঙালী বাণিজ্যের, পসরা ভাসিয়ে বিদেশে যাত্রা করে, নদীর জলে সিঞ্চিত মাটির ব্যকে ফসল ফলায় । বলতে গেলে এই নদীই বাংলাকে গড়ে তুলেছে, বাঙালীর ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে। সেই জন্যই তো নদীর সাথে বাঙালীর নাড়ীর টান।
  • বাংলা গোটা পূর্ব ভারতের নদীসমূহের সঙ্গমস্থল। উত্তর ভারত আর আসামের সমতলভূমি বেয়ে উপনদী-শাখানদীসমূহ নিয়ে নেমে এসেছে গঙ্গা-ব্রহ্মপত্র। বাংলার নরম পলিপড়া মাটিতে এসে নানা শাখা উপশাখায় বিভক্ত হয়েছে। এ যেন একটা বিরাট জাল গোটা বাংলাদেশ জড়ে বিস্তৃত। বর্ষার বিপুল জলরাশি সমগ্র উত্তর-ভারত আর আসামের পলি-প্রবাহ বয়ে নিয়ে এই জাল বেয়ে সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলার নবভূমি অনেকখানেই এই প্রচণ্ড ভার সহ্য করতে পারেনা। দুকুল জড়ে চলে ভাঙ্গা-গড়া। নদীর খাত বদলে সমৃদ্ধ নগর পরিত্যক্ত হয়, নতুন নগর গড়ে ওঠে।
  • পাক-ভারত উপমহাদেশে হিমযুগের পর থেকেই মানষ বসবাসের সুনির্দিষ্ট খবর পাওয়া যায়। তারও আগে হয়তো এখানে মানুষ বাস করতো। শিবালিক পাহাড়ে নর-বানরের দাঁত আর চোয়ালের হাড় পাওয়া গেছে। ক্রমে এই নর-বানরই হয়তো বিবর্তিত হয়ে এই উপমহাদেশের বুকে মানষ রূপে আবির্ভূত হয়েছিল। তবে এ-সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে আজও কিছু বলার উপায় নেই।
  • বেদে নিষাদের বর্ণনা আছে। মিশমিশে কালো রঙ, বেটে ধরনের গড়ন, ধ্যাবড়া নাক—মানষ। পণ্ডিতেরা মনে করেন এই নিষাদরাই ছিল বাংলাদেশের আদিবাসী।
  • বাঙলার জনতাত্ত্বিক ইতিহাসে এ-যেন এক বৈশিষ্ট্য। প্রাগৈতিহাসিক কালে বাঙলার মাটিতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পরস্পরের মাঝে রক্ত মিশ্রণের যে ধারার সূচনা হয়েছিল ঐতিহাসিক কালেও তা সমানভাবেই অব্যাহত রইলো। আর এভাবেই বাঙালীর সাথে রক্তের সম্পর্ক স্থাপিত হলো তিন মহাদেশ জোড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর।
  • পাঁচ ছজন হাবসী সলতান বেশ অনেক কাল জড়ে বাঙলাদেশে রাজত্ব করেছে। দীর্ঘ দিন এদেশে থাকায় ক্রমে তারাও বাঙালী হয়ে গিয়েছিল। তবু, তারা যে রক্তধারা সেদিন সঞ্চারিত করেছিল তার ফলেই উচ্চ-বর্ণের-হিন্দু-মসলমানের মাঝে আজও দু একটি খাঁটি হাবসী চেহারা চোখে পড়ে। সেই ঘন কোঁকড়া চল আর পর, ওল্টানো ঠোঁট-সাদা চোখেই হাবসী বলে চিহ্নিত করা যায়।
  • জলদস্যু মগরাও এক সময় বাঙালীর রক্তের সাথে রক্ত মিশিয়েছে।তবে এদের ধারার প্রভাব বাঙলার জনসমষ্টিতে খবই কম।

বহিঃসংযোগ

সম্পাদনা